রাজা, হিংসুটে উজির এবং বুদ্ধিমান গোলামের গল্প



আমাদের সমাজে এমন কিছু মানুষ আছে যারা অন্যের ভালো দেখতে পারে না। যাকে তারা ভালোবাসে না কিংবা পছন্দ করে না, তার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, দোষত্রুটি খুঁজে বেড়ায় এবং তার ক্ষতি করার সুযোগ খোঁজে। এসব বিদ্বেষী মানুষ শুধু নিজেদের ক্ষতি ডেকে আনে না, বরং অন্যদের জীবনেও অশান্তি নিয়ে আসে।

এক মনোবিজ্ঞানী বলেছেন, বিদ্বেষপরায়ণ ব্যক্তি খুব সহজেই রেগে যায় এবং সে একজন নির্দয় শত্রু। তার আচরণ অনেকটা সেই লোকের মতো, যে তার রুমাল হারিয়ে যাওয়ার কারণে পুরো বাজার জ্বালিয়ে দেয়। বিদ্বেষী ব্যক্তির অন্তরে ঘৃণা ও প্রতিশোধের এক ভয়ানক আগ্নেয়গিরি লুকিয়ে থাকে, যা সুযোগ পেলেই ধ্বংসের আগুন ছড়িয়ে দেয়। ইমাম আলী (আ.) বলেছেন, "যে আত্মা সর্বাধিক যন্ত্রণা ভোগ করে, তা হলো বিদ্বেষপরায়ণ ব্যক্তির আত্মা।"

বিদ্বেষ, হিংসা, শত্রুতা ও ঘৃণার মানসিকতা ত্যাগ করে আমরা যদি একে অপরের প্রতি ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যের হাত বাড়িয়ে দিই, তাহলে সমাজ আরও সুন্দর হয়ে উঠবে। এই উপলব্ধির আলোকে, আজ আমরা শুনব এক রাজা, তার হিংসুটে উজির এবং এক বুদ্ধিমান গোলামের গল্প।


এক সময়ের কথা। এক রাজা ছিলেন, যিনি ছিলেন বুদ্ধিমান কিন্তু কঠোর। তার অধীনে বহু চাকর-বাকর কাজ করত, কিন্তু তাদের প্রতি তার ব্যবহার ছিল বেশ রূঢ়। রাজার অত্যাচারে সবাই ভীত থাকলেও, এক বুদ্ধিমান গোলাম ছিল, যে এসব সহ্য করতে পারছিল না। অবশেষে, এক রাতে সে পালানোর সিদ্ধান্ত নিল।

কিন্তু রাজপ্রাসাদের চারদিকে ছিল কঠোর পাহারা। গোলামটি জানত, পালানো সহজ হবে না, তবুও সে সুযোগের অপেক্ষায় রইল। কিছু দূর যাওয়ার পর সে এক নিরাপদ জায়গায় গিয়ে লুকিয়ে পড়ল। কিন্তু বেশিক্ষণ সে আড়ালে থাকতে পারল না। খবর দ্রুত রাজার কানে পৌঁছালো। রাজা ক্ষিপ্ত হয়ে সৈন্যদের আদেশ দিলো, “যে করেই হোক, ওই গোলামকে ধরে আনতে হবে!”

প্রধান উজির আগে থেকেই গোলামকে পছন্দ করত না। সে গোলামের বুদ্ধিমত্তার কারণে নিজেকে বারবার অপমানিত অনুভব করত। তাই এই সুযোগে সে তার ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটাতে চাইল। উজির নিজেই সৈন্যদের নেতৃত্ব দিলো এবং শহরের চারপাশে গোলামের খোঁজ শুরু করল। শেষ পর্যন্ত তারা গোলামকে ধরে রাজদরবারে হাজির করল।

রাজা জানত, উজির সবসময় গোলামের ক্ষতি চেয়েছে। তাই সে উজিরকে জিজ্ঞেস করল, “হে উজিরে আজম! তোমার মতে, এই গোলামের কী শাস্তি হওয়া উচিত? তাকে ছেড়ে দেবো, নাকি মৃত্যুদণ্ড দেবো?”

উজির সঙ্গে সঙ্গে বলল, “বাদশাহ! আপনি তো নিজেই ঘোষণা করেছিলেন, যে চাকর পালানোর চেষ্টা করবে, তার শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড। তাই এই গোলামের মৃত্যুই একমাত্র উপযুক্ত শাস্তি।”

রাজা আসলে গোলামকে হত্যা করতে চাচ্ছিল না। কিন্তু উজিরের পরামর্শ শুনে সে জল্লাদকে ইশারা করল। গোলাম কিন্তু এতে মোটেও বিচলিত হলো না, বরং হাসল এবং বলল, “হে মহারাজ! আমি চাই না, খামোখা আমার মৃত্যুর দায়ভার আপনার ওপর পড়ুক। আমি তো আপনার অনেক নিমক খেয়েছি, আমি চাই না, এই হত্যার জন্য আপনাকে পরকালে আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করতে হোক।”

রাজা বিস্মিত হয়ে বলল, “তুই কি তাহলে নির্দোষ?”

গোলাম বলল, “হ্যাঁ, আমি কোনো অপরাধ করিনি। আমি পালিয়েছি স্বাধীনভাবে বাঁচার জন্য। আল্লাহর দৃষ্টিতে এটি অপরাধ নয়। তবে আপনার ও উজিরের চোখে এটি অপরাধ। কিন্তু আপনি যদি আমাকে হত্যা করেন, তাহলে এই হত্যার দায়ভার আপনাকে বহন করতে হবে।”

রাজা বুঝতে পারল, গোলামের মনে কোনো পরিকল্পনা আছে। তাই সে গোলামকে আরেকটি সুযোগ দিলো এবং বলল, “ঠিক আছে! তোর যুক্তি কী? বল, কী করলে তোকে হত্যা করা বৈধ হবে?”

গোলাম ঠাণ্ডা মাথায় উত্তর দিলো, “আপনার উজিরকে হত্যা করার অনুমতি দিন আমাকে!”

রাজা হতবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “উজিরকে হত্যা করবি? কিন্তু কেন?”

গোলাম বলল, “যদি আমি উজিরকে হত্যা করি, তাহলে আমি খুনি হবো। ফলে আপনি আমাকে কেসাস (বদলা) হিসেবে হত্যা করতে পারবেন। এতে হত্যার দায়ভারও আপনার ওপর পড়বে না।”

রাজা মুচকি হেসে উজিরের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি কী বলো, উজির?”

উজির এবার লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল। এরপর অসহায় কণ্ঠে বলল, “আমাকে আরও বিপদে ফেলার আগে, দয়া করে এই গোলামকে মুক্ত করে দিন। আসলে দোষ আমারই। আমি শত্রুতা করেছি তার সঙ্গে। আমি ভুলে গিয়েছিলাম, ‘যে অন্যের জন্য গর্ত খনন করে, সে নিজেই সেই গর্তে পড়ে যায়।’”

রাজা আনন্দিত হয়ে বললেন, “গোলাম, তুই প্রমাণ করেছিস যে জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তা সবচেয়ে বড় শক্তি। আমি তোকে মুক্তি দিলাম।”

এইভাবে বুদ্ধি ও ধৈর্যের জয় হলো, আর বিদ্বেষী উজির নিজের জালেই নিজে আটকা পড়ল। গল্পের শিক্ষাটি হলো— হিংসা ও বিদ্বেষ মানুষকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যায়, কিন্তু বুদ্ধি ও সততা সর্বদা জয়ী হয়।

Post a Comment

Previous Post Next Post

Popular Items